December 4, 2022

দৈনিক প্রথম কথা

বাংলাদেশের জাতীয় দৈনিক

প্রজন্ম ’৭১ এর পথ চলা-

শাহীন রেজা নূর : প্রজন্ম ’৭১ এর পঁচিশ বছর পূর্তি উপলক্ষে সংগঠনের সকল ভাই- বোনকে জানাই প্রাণঢালা শুভেচ্ছা। আজ থেকে ২৫ বছর আগে প্রজন্ম ’৭১ এর জন্মলগ্নে বাংলাদেশের পরিস্থিতি ছিল দুর্মর শৃঙ্খলে আবদ্ধ। একাত্তরের হায়না-শ্বাপদদের পুঃন আস্ফালনে তখন স্বাধীন বাংলার সূর্য আবার অস্তাচলে ঢলে পড়ার উপক্রম! আমরা শহীদের সন্তানেরা আর মুক্তিযুদ্ধের চেতনাস্নাত সকলে এক গভীর অমানিশার করাল গ্রাসে নিপতিত। অশুভের ইঙ্গিতবাহী এক প্রকার গা ছম ছম করা ঘন কৃষ্ণ মেঘরাশিতে ছেয়ে যাচ্ছে সব। চারিদিকে নেমে আসছে নিকষ কালো আঁধার আর ভীতি ছড়ানো ভয়াবহ পরিবেশ! একটু কান পাতলেই শোনা যায়, একাত্তরের ঘাতক ও ধর্ষকদের কর্কশ কন্ঠের আওয়াজ আর ক্রমান্বয়ে তা আমাদের কর্ণকুহর ভেদ করে নারকীয় উল্লাস ছড়াতে থাকে। একটু চোখ মেললেই স্পষ্ট দেখা যায়, হানাদার পাকিস্তানী বাহিনীর এদেশী দোসর সেই আল্ বদর, আল্ শামস, রাজাকারদের মানুষখেকো চেহারা। জেনারেল জিয়াউর রহমানের আশীর্বাদসিক্ত হয়ে বাংলার মাটিতে পুনরায় ঠাঁই পাওয়া এই নারকীয় কীটেরা তাদের কুৎসিত দন্ত- নখর মেলে খামচে ধরতে থাকে তিরিশ লক্ষ বাঙ্গালীর শোনিত প্রবাহে আর চার লক্ষ মা-বোনের সম্ভ্রমের চাদরে মোড়া বাংলাদেশকে। বীরের রক্ত¯্রােত আর মাতার অশ্রুধারার মহামূল্যে কেনা বাংলার স্বাধীনতা বুঝিবা ভুলুন্ঠিত হতে চলেছে আবার! বাংলার পূণ্যভূমির সর্বত্র চির নিদ্রায় শায়িত লাখো শহীদের আর লাখো ‘হতভাগিনী-ধর্ষিতা-নাগিনী’র আর্তনাদ ভেসে আসতে থাকে বাতাসের উপর ভর করে। উৎকর্ণ যারা, তারা অনায়াসে শুনতে পান সেই ক্রন্দনধ্বনি, স্বচ্ছ দৃষ্টির অধিকারী যারা, তারা দেখতে পান মানুষ জন্তুর হিংস্র উন্মাদনা।
ঠিক এমনি এক ঘোরতর দুঃসময়ে বীরাঙ্গনা খাওলার মতো, মাতঙ্গিনী হাজরার মতো, হালিদা এদিব হানমের মতো, জামিলা বুখারিদের মতো দৃপ্ত পদভারে ও অসুর বধের শপথ কন্ঠে ধারন করে এগিয়ে এলেন শহীদ জননী জাহানারা ইমাম। একাত্তরের ঘাতকদের বিচারের দাবীতে বাংলার আকাশ-বাতাস মুখরিত করে তুললেন তিনি। শহীদ পরিবারগুলির মনে নতুন চেতনা ও আশার সঞ্চার করলেন শহীদ জননী। শহীদ সন্তানদের সংগঠন প্রজন্ম ’৭১ এর জন্ম হোল। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কন্যা শেখ হাসিনা বিরোধী দলীয় নেত্রী তখন। বাংলাদেশকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সড়কে দাঁড় করানোর জন্য তিনিও বীর দর্পে যুঝে চলেছেন অপশক্তির বিরুদ্ধে। শহীদ জননীর আন্দোলনের প্রতি শুধু পূর্ণ সমর্থনই নয়, একে মঞ্জিলে মকসুদে পৌঁছে দেবার জন্য কোমর বেঁধে নেমেছেন তিনি। একাত্তরের ঘাতক-দালাল নির্মূল কমিটি আর মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়ন কমিটির নেতারা আর মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের সবাই জান কবুল করে রাস্তায় নেমেছে অসুর বধের দুর্নিবার আকাংখায়। এমন এক পরিস্থিতিতে শহীদ পরিবারগুলি কি নীরব থাকতে পারে? শেখ হাসিনা ও শহীদ জননী তখন তাদের শক্তি-সাহস ও প্রত্যয়ের উৎসভূমি।
চারিদিকে চক্রান্তের বেড়াজাল, মোনাফেক আর চোগলখোরের সংখ্যাও কম নয়। বহুরূপী ও বর্ণচোরাদের চেনাও মুস্কিল! আন্দোলন নস্যাৎ করার জন্য সর্বত্র ঘাপটি মেরে বসে রয়েছে ওরা। এমন পরিস্থিতিতে বাংলায় নুরুলদীনদের ডাক পড়েছে আবার। ‘জাগাও বাংলা বাঁচাও দেশ, দৈত্য-দানব করগো শেষ’। মানুষের মনের এই আকুতি নাগিনীর অগ্নি জিহ্বা হয়ে সারা দেশে লক্ লক্ করে নেচে বেড়াচ্ছে। এই অবস্থায় শহীদের সন্তানেরা কি করে ঘরে বসে থাকবে? ইতিহাস ‘তোদের ডাক দিয়েছে–আয়রে ছুটে আয় আয় আয়’। এই তো অবস্থা তখন। অধ্যাপক জ্যোতির্ময় গুহ ঠাকুরতার কন্যা ডঃ মেঘনা গুহ ঠাকুরতা, সৈয়দপুরের শহীদ প্রকৌশলীর সন্তান সাঈদুর রহমান, শহীদ সাংবাদিক সিরাজুদ্দীন হোসেনের সন্তান তৌহিদ রেজা নূর, সাংবাদিক সাহিত্যিক শহীদুল্লাহ কায়সারের কন্যা শমি কায়সার, শহীদ অধ্যাপক মুনীর চৌধুরীর সন্তান আসিফ মুনীর তন্ময়, শহীদ চিকিৎসক ডাঃ আলীম চৌধুরীর মেয়ে নুজহাত চৌধুরী শম্পা ও ফারজানা চৌধুরী নিপা, শহীদ জহীর রায়হানের পুত্র অনল রায়হান, শহীদ সেলিনা পারভীনের পুত্র সুমন জাহীদ, শহীদ মধু দা’র সন্তান বাবুল চন্দ্র দে, অরুণ চন্দ্র দে, শহীদ ডাঃ আজহারুল হকের ছেলে আশরাফুল হক নিশানসহ অনেক শহীদ সন্তান সেদিন ইতিহাসের দাবী পুরন করতে নিহত পিতা-মাতাদের মতো দূর্বার বেগে ছুটে গিয়েছিল বাংলার পথে-প্রান্তরে। শুধু উল্লিখিত শহীদ সন্তানেরাই নয় আমরা দেখেছি নটো কিশোর আদিত্য, মিজানুর রহমান, আব্বাস, ফাহমিদা, চঞ্চল, নারগিস, তাহমিনা, সোমা, শোভন, বশির, বুলবুল, নীলা এবং আরও অনেককে সেদিন পিতা-মাতার নৃশংস হত্যাকান্ডের বিচারের দাবীতে বুকভরা ব্যথা আর চোখভরা অশ্রু নিয়ে বাংলার মানুষের কাছে ফরিয়াদ জানাতে। ঘাতকদের বিচারের সে দাবীর মধ্যে কোন প্রতিহিংসা চরিতার্থ করার বিষয় ছিলনা, ছিল ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠার দাবী, আরও ছিল রাষ্ট্রের দায় মোচনের দাবী।
১৯৯১ সালে গণআদালতে চিহ্নিত ঘাতকদের বিচারের আয়োজন করা হলে শহীদ সন্তানদের মনের কথা ছিল একটাই আর তা হোলঃ ‘থাকবোনাকো বদ্ধ ঘরে’। তাই অগ্নিবরণ নাগ-নাগিনী পুঞ্জের মতো অন্য সকলের সঙ্গে ধেয়ে গেল তারা ন্যায় বিচারের দাবীতে। ব্যথা-বেদনার স্রোতে ভেসে চলা শহীদ পরিবারগুলির নিশ্বাস বনহিতে আকাশ যেন পাংশু বর্ণ ধারন করলো, বাতাস বুঝিবা রেঙ্গে উঠলো! শহীদ জায়ারা ম্লান-মুক মুখে আল্লাহর দরবারে দু’হাত মেলে ধরে ন্যায় বিচারের প্রত্যাশায় জায়নামাজে বসে বহু বিনিদ্র রজনী কাটাতে লাগলেন। কিন্তু চক্রান্ত থেমে থাকলোনা, বরং খালেদা জিয়ার বিএনপি সরকারকে এই সত্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার দাবী ও আন্দোলনকে শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে আর মিথ্যা মামলা ও নানান হামলা চালিয়ে নস্যাৎ করতে মেতে উঠতে দেখলো জাতি! বিএনপি একাত্তরের ঘাতকদের রক্ষা করতে এবং দেশের সর্বত্র তাদের পুনর্বাসিত করতে রাষ্ট্র যন্ত্রকে ব্যবহার করতে থাকলো জামাতকে বান্ধব বানিয়ে।
এর পর জাতিকে কত আত্মত্যাগ করতে হয়েছে মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশকে ফিরিয়ে আনতে তাতো কম বেশী সকলের জানা। অসীম সাহসের উপর ভর করে পাকিস্তানবাদী বিএনপি-জামাতের বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান নিয়ে এবং জীবনের ঝুঁকি নিয়ে অন্য সকলের সঙ্গে প্রজন্ম-’৭১ এর সদস্যরা ন্যায় প্রতিষ্ঠার আন্দোলন চালিয়ে গেছে। আর এই উপায়ে তারা আমাকে কৃতজ্ঞতাপাশে আবদ্ধ করেছে। আমি তাদের সকলের জন্য গর্বিত।
যাহোক, দেশকে গনমানুষের সার্বিক কল্যান ও মুক্তির নিরাপদ আশ্রয়স্থলে পরিনত করতে শহীদ পরিবারগুলিরও দায় রয়েছে; আর সে দায় মোচনের জন্য সকলে বরাবরের মতোই সচেষ্ট থাকবে এই গভীর বিশ্বাস পোষন করছি। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বাংলাদেশ থেকে দানব দুরীকরনে শেখ হাসিনার সরকারের অনেকখানি সাফল্যের পশ্চাতে অন্য অনেকের সঙ্গে প্রজন্ম ’৭১ এরও বেশ অবদান রয়েছে। এই দানব বিতাড়নের সংগ্রামে এই সংগঠন শামিল ছিল, শামিল রয়েছে এবং শামিল থাকবে এই হোক এই প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীর অঙ্গীকার।
মেঘের আড়ালে লুকিয়ে থাকা মুক্তিযুদ্ধের চেতনাদীপ্ত সেই প্রদীপ্ত সূর্যটাকে ফিরিয়ে আনতে শেখ হাসিনার প্রানপন প্রয়াসের মধ্য দিয়ে ক্ষুদিরাম-তীতুমীর-সূর্য সেন-বাঘা যতীনের বাংলায় ফের সাজ সাজ রব পড়েছে। সবার কন্ঠে একই আহাজারী ধ্বনিত প্রতিধ্বনিত হয়ে ফিরছেঃ
‘বাংলা আমার জননী আমার ধাত্রী আমার, আমার দেশ,
কেন গো মা তোর ধুলায় আসন, কেনো গো মা তোর মলিন বেশ?’
আজকের এই দিনে প্রজন্ম’৭১ এর অন্তর নিংড়ানো প্রত্যাশা এই যে, একাত্তরের চেতনা ভিসুভিয়াসের অগ্নি¯্রাবী মূর্তি পরিগ্রহ করে বার বার ফিরে আসুক এই বাংলায়; অজেয় মুজিবের সেই সিংহ নাদে পুনরায় থর থর করে কেঁপে উঠুক মেদিনী; আবার একটি মুজিবরের থেকে লক্ষ মুজিবরের কন্ঠস্বরের ধ্বনি- প্রতিধ্বনি আকশে-বাতাসে অনুরনন তুলুক।
লেখক : সভাপতি, প্রজন্ম ’৭১, শহীদ সাংবাদিক সিরাজুদ্দিন হোসেনের সন্তান।