December 5, 2022

দৈনিক প্রথম কথা

বাংলাদেশের জাতীয় দৈনিক

প্যারী মোহন আদিত্যকে যেমন দেখেছি

বীর মুক্তিযোদ্ধা মো: মতিয়ার রহমান খান : প্যারী মোহন আদিত্য সম্পর্কে খুব নতুন করে বলার কিছু নেই। তিনি বেঁচে আছেন বাংলার মাটিতে। তবুও আমাদের থেকে দূরে নির্জনবাস এখন কার্যত এক ধরনের স্মৃতি।

স্বাধীনাতার সৈনিক যাঁরা, যাঁদের জীবনের বিনিময়ে এই প্রাপ্তি, তাদের কয়জনকে আমরা ইতিহাসে স্থান দিয়েছি,বা মনে রেখেছি? তৎকালীন শাসকগোষ্ঠীর রোষানলে পতিত হন প্যারী মোহন আদিত্য। আবার স্বাধীনতা বিরোধীদের সাথে হাত মিলান অনেকেই। আজও তারা পরোক্ষভাবে স্বাধীনতা বিরোধীর সাথে জড়িত।

১৯৩৪ সালের ৫ই জুন টাঙ্গাইল জেলার পাকুটিয়া গ্রামে প্যারী মোহন আদিত্য জন্মগ্রহন করেন। তাঁর বাবার নাম মুকুন্দ মোহন আদিত্য। মায়ের নাম মহামায়া আদিত্য। সৎসঙ্গ প্রতিষ্ঠানের জন্য যে মেধা শ্রম, নিষ্ঠার প্রয়োজন তার পরিপূর্ন অধিকারী ছিলেন প্যারী মোহন আদিত্য। তিনি শ্রীশ্রীঠাকুরের পাদুকা এনে আশ্রম প্রতিষ্ঠার কাজ শুরু করেন। তিনি নির্লোভ হয়ে সংগঠন ও দেশকে ভাল বেসেছিলেন।

১৯৪৭ এর দেশভাগ বাঙ্গালীদের জন্য কোন সুফল বয়ে আনেনি। ধর্মীয় জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে পাকিস্তান সৃষ্টি হয়। বৃটিশদের শোষনের চেয়েও পাকিস্তানী শাসকরা আরো বেশি শোষণ করতে শুরু করে। ব্যাপক অর্থনৈতিক বিভক্তি এ বাংলার মানুষের জীবন জীবিকা, যাপিত জীবনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। শহীদ প্যারী মোহন আাদিত্যের জীবনেও সেই প্রভাব প্রকট হয়ে দেখা দেয়। জাতীয় জীবনে বিপর্যয়কারী এ ঘটনার প্রভাব পড়েছিল উপমহাদেশের সর্বত্র। আর প্যারী মোহন আদিত্য সংসারের প্রতিটি সদস্যের মুখের দিকে তাকিয়ে তিনি নেমে আসেন পৈত্রিক ব্যবসায়। সংসারের একমাত্র উপার্জনশীল ব্যক্তি হিসাবে সংসার পরিচালনার দায়িত্ব পালন করেন। কর্মোদ্দমী মানুষের পশাপাশি গ্রামের বিভিন্ন সাংস্কৃতিক ও সমাজিক কর্মকান্ডেও তিনি জাড়িত ছিলেন। সৌখিক যাত্রাপালা, গ্রাম্য নাটক, থিয়েটার এর অন্যতম সংগঠক হিসাবে দায়িত্ব পালন করতেন তিনি।

১৯৭১ সালের কথা। যৌবনের জোয়ারে জীবনের উচ্ছ¡সিত প্রাচুর্য্যে প্যারী মোহন আদিত্য মানুষকে বাঁচার গান শোনাতেন। তিনি কাপড় পরতেন কখনো কোঁচা দিয়ে, কখনও বা কোঁচার অংশটা মাজায় বেঁধে। কিন্ত চলার সময় কাপড় একেবারে হাঁটুর উপর গুটিয়ে নিতেন। প্রতিদিন বিকাল বেলা পাকুটিয় বাসষ্টেন্ডে তাঁর মনোহারী দোকানে আমরা বসতাম। আমার কিছটা মনে আছে প্যারী মোহন আদিত্য আমাকে বলেছিলেন, ’প্রথম দর্শনের ভাবটাই নাকি স্থায়ী ভাবে মনে থাকে।’ আসলে তাই, যতদিন আমি তাঁর সাথে মিশেছি ততই তিনি অসম্ভব রকমের অস্বাভাবিক ব’লে আামার মনে হ’তো। তাঁর সামনে কোন মানুষ ঝগড়া করলে তা তিনি পছন্দ করতেন না। কিন্তু বিচারের জন্য কেউ যখন তাঁর কাছে আসতেন তিনি মুহুর্তের মধ্যে সব পানি করে দিতেন। সুবিচার তো বটেই।
প্যারী মোহন আদিত্য তিনি নিজেই অসচ্ছল, তবুও কোন গরিব তার কাছে সাহায্যের জন্য, কোন পরামর্শেও জন্য এসেছে, কিংবা বিপদগামী সন্তানের পরিবর্তন কিভাবে কারা যায়, তা জানতে চাইছেন, তিনি দোকান বাদ দিয়ে তাদেরকে কি করতে হবে তার পরামর্শ দিতেন। তাঁর কোন আলস্য নেই, ক্লান্তি নেই।

ভালবাসা এবং শান্তি এই হচ্ছে মানুষের চিরন্তন লক্ষ্য। কিন্তু মানুষ বলে থাকেন জীবনে ইহার উপর ভিত্তি ক’রে চলা বলা সম্ভব নয়। প্যারী মোহন আদিত্য শ্রীশ্রীঠাকুরের উদাহরন দিয়ে বলতেন,’ ভালবাসা মানে যাকে ভালবাসি তার খেয়াল খুশিমত চলা নয়, যাতে ভাল হয়, পরিবেশ ভাল থাকে, দেশ ভাল থাকে, আর সমসময় ভালোর মধ্যে বাস করা, ভাল চিন্তা করা এবং ভাল কাজ করা।’

প্যারী মোহন আদিত্য দেশের বিভিন্ন জায়গায় বক্তৃতা করেন শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূল চন্দ্রের মহিমা কীর্তন নিয়ে। তার মানুষের প্রতি ভালবাসা, কল্যানমূলাক কাজ করা আমাকে অবাক করে দেয়। সামান্য মানুষের ভিতর দিয়ে সৃষ্টিকর্তার মহিমা প্রকাশ পায় এই হল ভক্তির গুন। তিনি বলতেন, ”গতানুগতিক প্রেমহীন ধর্মকে, অনুষ্ঠান ও অনুশাসনসর্বস্ব ধর্মকে ঠাকুর চিরদিনই অবজ্ঞা ভেবে দেখে গেছেন। যে ধর্ম মানুষকে সমুন্নত জীবনের সন্ধান দিতে পেরেছে, মুক্তি দিতে পেরেছে, অন্ধকারে আলো দিতে পেরেছে, আপন জীবন-জিজ্ঞাসার মনুষ্যত্বের মহানপট ভূমিকায় তুলে ধরতে পেরেছে, তাই ছিল ঠাকুরের ধর্ম”।

১৯৭১ এর ৮ আগষ্ট টাঙ্গাইল হইতে মধুপুর যাওয়ার পথে পাক হানাদার বাহিনী পাকুটিয়া আশ্রম আক্রমন করে এবং এলোপাথারী গুলি চালাতে থাকলে পাক হানাদার বাহিনীর গুলি প্যারী মোহন আদিত্যের তলপেটে লেগে অন্যপাশ দিয়ে বের হয়ে যায়। তিনি মন্দিরের সামনে পরে যান। মন্দিরে সামনে থেকে পাকি¯তানী সেনারা তাঁকে টেনে হিঁচরে সামনে নিয়ে এসে লাথি আর বেয়নেট চার্চ করে হত্যা করে। তাঁর মরদেহ আশ্রমের দক্ষিন পাশের তাঁর বাড়ীতেই সৎকার করা হয়।

১৯৭১ এ ৩৫ বছরের প্রাণোচ্ছল এক যুবক। সদাহাস্য সদালাপী সদাচারী ও উচ্ছুসিত উপস্থিতিতে তিনি মাতিয়ে রাখতেন তাঁর নিজের লেখা গান গল্প দিয়ে সৎসঙ্গের আসর। এত প্রাণবন্ত, এত মিশুক, এত হাস্যোজ্জ্বল একজন মানুষ তিনি ছিলেন যে, সৎসঙ্গের ভক্ত, এলাকার লোকজন, শ্রদ্ধার ও ¯েœহভাজনেরা এখনো বিশ্বাস করতে পারেন না তিনি নেই। সৎসঙ্গের কোন অনুষ্ঠানে গিয়ে বা কোন যাত্রার রিয়ারসেলে গিয়ে কিছুক্ষণ পর পরই মনে হচ্ছে এই বুঝি ছুটে এসে তার স্বভাবসুলভ মণ খোলা হাসি ভঙ্গিতে জিজ্ঞেস করবেন, দাদা, কেমন আছো? ভাই কেমন আছো? কাকা আপনারা কেমন আছেন? ছোটদের বলতেন, বাবা, তোমরা কেমন আছো? পড়াশুনা কেমন চলছে? তোমাদের বাড়ীর সবাই কে কেমন আছে? সবাইকে ভাল থাকতে হবে। কখনো একা একা ভাল থাকা যায় না’। আবার গভীর মমতা ও দরদ দিয়ে মগ্ন হতেন কোন রোগমুক্তি বা সাফল্য কামনার একাগ্র প্রার্থনায়।

লেখক: সাবেক ইউনিয়ন কমান্ডার, ১নং দেউলা বাড়ী ইউনিয়ন কমান্ডা, ঘাটাইল ।