1
March 2, 2021

দৈনিক প্রথম কথা

বাংলাদেশের জাতীয় দৈনিক

ঋতুপর্ণ ঘোষ আমদের প্রজন্মের একজন সৃষ্টিশীল মানুষ

আলী আসগর স্বপনঃ  ঋতু পর্ণ ঘোষ আমদের প্রজন্মের একজন সৃষ্টিশীল মানুষ। তার তাড়াহুড়ো করে চলে যাওয়া মানতে কষ্ট হয়।
ঋতুপর্ণ ঘোষ বাঙালি পরিচালকদের মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয়, আলোচিত ও বিতর্কিত চলচ্চিত্র পরিচালকদের একজন। তাঁর বৈচিত্র্যময় জীবন অনেকে সাদরে গ্রহণ করেছেন, অনেকের কৌতূহলের খোরাক জুগিয়েছে। আবার অনেকে আড়চোখে তাকিয়ে বা দূরে থেকে সমালোচনা করেছেন।
যাদবপুরবিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির ছাত্র ঋতুপর্ণ ঘোষের কর্মজীবন শুরু হয়েছিল একটি বিজ্ঞাপন সংস্থার ক্রিয়েটিভ আর্টিস্ট হিসেবে। ১৯৯২ সালে মুক্তি পায় তাঁর প্রথম ছবি ‘হিরের আংটি’। দ্বিতীয় ছবি ‘উনিশে এপ্রিল’ মুক্তি পায় ১৯৯৪ সালে। এই ছবির জন্য তিনি শ্রেষ্ঠ কাহিনিচিত্র বিভাগে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পান। তার ১৯টি চলচিত্রের মধ্যে ১২টি ছবিই জাতীয় পুরস্কার অর্জন করে।
ছবি পরিচালনার মধ্য দিয়ে নিজেকে কিংবদন্তি পরিচালক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন।অমিতাভ বচ্চন, মনীষা কৈরালা, ঐশ্বরিয়া রায় বচ্চন, জ্যাকি শ্রফ, সোহা আলী খান, রাখি গুলজার, রাইমা সেন, রিয়া সেন, শর্মিলা ঠাকুর, নন্দিতা দাস, প্রীতি জিনতা, অর্জুন রামপাল, যীশু সেনগুপ্ত, দীপংকর দে বা মমতা শংকরের মতো অভিনয়শিল্পীরা এসব ছবিতে দুর্দান্ত অভিনয় করেছেন। এই ছবিগুলো ঋতুপর্ণ ঘোষকে এনে দিয়েছে ১২টি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার। তা ছাড়া বার্লিন, লোকার্নো, শিকাগো, বুসান, বোম্বে প্রভৃতি আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব থেকে একাধিক আন্তর্জাতিক পুরস্কারসহ অসংখ্য সম্মাননা পেয়েছেন গুণী এই নির্মাতা।
সিনেমা পরিচালনা ছাড়াও ঋতুপর্ণ ঘোষ প্রথম অভিনয় করেন ওড়িয়া ছবি ‘কথা দেইথিল্লি মা কু’তে। হিমাংশু পারিজা পরিচালিত এই ছবিটি মুক্তি পায় ২০০৩ সালে। ২০১১ সালে তিনি কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায়ের আরেকটি প্রেমের গল্প এবং সঞ্জয় নাগের ‘মেমোরিজ ইন মার্চ’ ছবিতে অভিনয় করেন। এ ছাড়া তাঁর পরিচালিত ও মুক্তিপ্রাপ্ত সর্বশেষ ছবি ‘চিত্রাঙ্গদা’তেও তিনি অভিনয় করেন।
ঋতুপর্ণ ঘোষ ১০ বছর ধরে ডায়াবেটিসে এবং ৫ বছর ধরে প্যানক্রিয়াটিস রোগে ভুগছিলেন। প্রায় সারা জীবন তিনি ভয়াবহ অনিদ্রা রোগে ভুগেছেন। সে জন্য তিনি নিয়মিত ঘুমের ওষুধ খেয়েছেন। ডাক্তারদের রিপোর্ট অনুযায়ী, অ্যাবডোমিনোপ্ল্যাস্টি ও ব্রেস্ট ইমপ্ল্যান্টের পর প্রয়োজনীয় হরমোন রিপ্লেসমেন্ট থেরাপি করাতে গিয়ে তাঁর শারীরিক অসুস্থতা বেড়ে যায়। অবশেষে ২০১৩ সালের ৩০ মে কলকাতার বাড়িতেই হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত হয়ে ঋতুপর্ণ ঘোষের মৃত্যু হয়।তাঁর এই অকাল
মৃত্যুতে শোকে স্তব্ধ হয়ে যায় পুরো টলিউড এবং বলিউড। অমিতাভ বচ্চন তাঁর স্মৃতিচারণায় বলেন, ঋতুপর্ণ ঘোষ একমাত্র পরিচালক যিনি বচ্চন পরিবারের সবার সঙ্গে কাজ করেছেন। একটি টুইটে তিনি লেখেন, ঋতুপর্ণ ছিলেন এক সংবেদনশীল শিল্পমনস্ক নরম মনের মানুষ। ঋতুপর্ণর ‘তিতলি’ ও ‘দোসর’ ছবির নায়িকা কঙ্কণা সেন শর্মা বলেন, ‘এটা আমার ব্যক্তিগত ক্ষতি।’ চিত্র পরিচালক শ্যাম বেনেগাল বলেন, ‘ঋতুপর্ণের মৃত্যু এক বিরাট ট্র্যাজেডি।’ অভিনেত্রী কিরণ খের ঋতুপর্ণের শিশুসুলভ প্রাণোচ্ছ্বলতার কথা স্মরণ করে বলেন, ‘চলচ্চিত্র জগৎ অশিক্ষিত লোকে ভর্তি। সেখানে ঋতুপর্ণ ছিলেন একজন শিক্ষিত মানুষ। তাঁর নিজস্ব একটা লাইব্রেরি ছিল এবং তিনি ধর্মকর্ম করার মতো করে পড়াশোনা করতেন। তাঁর জ্ঞানের কোনো তুলনা নেই।’
সে যা-ই হোক। যিনি চলে গেছেন চিরতরে, তিনি তো আর ফিরবেন না। কৌশিক গাঙ্গুলির স্ত্রী, পরিচালক চূর্ণি গাঙ্গুলির সর্বশেষ ছবি ‘তারিখ’ মুক্তি পেয়েছে ১২ এপ্রিল। এই ছবি নিয়ে কথা বলার সময় এই পরিচালক বললেন ঋতুপর্ণ ঘোষের সঙ্গে তাঁর শেষ সাক্ষাৎ, বন্ধুত্ব আর ফেসবুক পোস্ট নিয়ে।চূর্ণি গাঙ্গুলি বলেন, ‘তুমি কি জানো ঋতুদার শেষ ফেসবুক পোস্ট কী ছিল? এটা ছিল রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিখ্যাত লাইন, “মনে রেখো আমায়।” তিনি এই কথাটি যেদিন লিখেছিলেন, সেদিনই আমরা শেষ দেখা করি। এটি তাঁর মৃত্যুর তিন সপ্তাহ আগের ঘটনা। সেদিন আমরা একসঙ্গে ঘুরতে বের হয়েছিলাম। ওই দিন দারুণ আড্ডা দিই। কেননা আমি সব সময়ই তাঁকে গভীরভাবে বুঝতে চাইতাম। কলকাতা বিমানবন্দরে বিদায় নেওয়ার সময় তিনি আমাকে তাঁর (ঋতুপর্ণ ঘোষের) বাসায় যেতে অনুরোধ করেন। আমিও কথা দিই, যাব। কিন্তু আমার যাওয়ার আগে তিনিই আমাদের সবাইকে ছেড়ে চলে গেলেন। এটিই ছিল তাঁর সঙ্গে আমার শেষ সাক্ষাৎ।’
ঋতুপর্ণ ঘোষের জন্ম ৩১ আগস্ট, ১৯৬৩, কলকাতায়, মারা যান ৪৯ বয়সে ৩০ মে, ২০১৩, কলকাতায়।
পিতামাতা: সুনিল ঘোষ
পুরস্কার: শ্রেষ্ঠ বাঙালা পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রের জন্য জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার, আরও বেশি
ঋতুপর্ণ ঘোষ কী পুরুষ ছিল নাকি নারী। নাকি নারী-পুরুষ দুটোই ছিল। তবে কী হিজড়ে ছিল ঋতুপর্ণ। কেউ কেউ ঋতুকে সমকামীও বলতেন অনেকেই।..
ঋতুপর্ণ ঘোষের মেধা এবং প্রতিভার ফসল মোট ১৯টি ছবি। প্রত্যেকটি ছবিই স্বতন্ত্র,অনবদ্য। ১৯টি ছবির মধ্যে ১২টি জাতীয় পুরষ্কার জয় করেছিল।ঋতুপর্ণ ঘোষের সবচাইতে বড় যে গুণ পরিচালক হিসেবে তা হচ্ছে, যে কোন মানুষকে দুর্দান্ত অভিনেতা/অভিনেত্রীতে পরিণত করা।ঋতুপর্ণ ঘোষ সাউথ পয়েন্ট হাই স্কুলের ছাত্র ছিলেন। পরে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে ডিগ্রি অর্জন করেন।
“কদর তো কতজনে করে,
ভালোবাসার সাহস কয়জনের আছে বলো তো!”
-ঋতুপর্ণ ঘোষ
ঋতুপর্ণ ঘোষ (জন্ম: ৩১শে অগস্ট, ১৯৬৩ – মৃত্যু: ৩০শে মে, ২০১৩) ছিলেন একজন ভারতীয় বাঙালি চলচ্চিত্র পরিচালক।
কলকাতায় জন্ম নেওয়া ঋতুপর্ণ ঘোষের বাবা-মা উভয়েই চলচ্চিত্র জগতের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। বাবা সুনীল ঘোষ ছিলেন তথ্যচিত্র-নির্মাতা ও চিত্রকর। ঋতুপর্ণ ঘোষ সাউথ পয়েন্ট হাই স্কুলের ছাত্র ছিলেন। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে ডিগ্রি অর্জন করেন।
অর্থনীতির ছাত্র ঋতুপর্ণ ঘোষের কর্মজীবন শুরু হয়েছিল একটি বিজ্ঞাপন সংস্থার ক্রিয়েটিভ আর্টিস্ট হিসেবে।
১৯৯২ সালে মুক্তি পায় তার প্রথম ছবি হীরের আংটি। দ্বিতীয় ছবি উনিশে এপ্রিল মুক্তি পায় ১৯৯৪ সালে। এই ছবির জন্য তিনি শ্রেষ্ঠ কাহিনিচিত্র বিভাগে জাতীয় পুরস্কার পান।
২০০৩ সালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের “চোখের বালি” উপন্যাস অবলম্বনে চিত্রায়িত “চোখের বালি” চলচ্চিত্র পরিচালনা করেছেন ঋতুপর্ণ ঘোষ। এতে অভিনয় করেছেন ঐশ্বরিয়া রাই বচ্চন, প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়, রাইমা সেন। ঐশ্বরিয়া এখানে ‘বিনোদিনী’ ও রাইমা সেন ‘আশালতা’ চরিত্রে অভিনয় করেন। পরে এটি হিন্দি ও জার্মান ভাষাতেও মুক্তি পায়। পরবর্তীতে আন্তর্জাতিকভাবেও এটি প্রকাশ পায়।
ঋতুপর্ণ ঘোষ ছিলেন সত্যজিৎ রায়ের অনুরাগী। দুই দশকের কর্মজীবনে তিনি বারোটি জাতীয় পুরস্কারের পাশাপাশি কয়েকটি আন্তর্জাতিক পুরস্কারও পেয়েছিলেন।
ঋতুপর্ণ ঘোষ ছিলেন ভারতের এলজিবিটি সম্প্রদায়ের এক বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব। জীবনের শেষ বছরগুলিতে তিনি রূপান্তরকামী জীবনযাত্রা নিয়ে নানা পরীক্ষানিরীক্ষা করছিলেন। তিনি নিজের সমকামী সত্ত্বাটিকে খোলাখুলিভাবে স্বীকার করে নেন, যা ভারতের চলচ্চিত্র জগতের খুব কম মানুষ করেছেন।
ঋতুপর্ণ ঘোষ ২০১৩ সালের ৩০ মে কলকাতায় হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু বরণ করেন।
সূত্র: অনলাইন