April 20, 2021

দৈনিক প্রথম কথা

বাংলাদেশের জাতীয় দৈনিক

বাংলা ছড়াসাহিত্য ও শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র

রিন্টু কুমার চৌধুরী: বাংলা ভাষা ও সাহিত্য আমাদের আত্ম পরিচয়ের জলন্ত প্রামাণ্য দলিল। একটি জাতি কতটা অগ্রসরমান তা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে সে জাতির ভাষা ও সাহিত্য। বাংলা ভাষাকে প্রথম রাষ্ট্রীয় সম্মানে যারা ভূষিত করেছিলেন, প্রথমেই বাঙূালী জাতির সেইসব শ্রেষ্ঠ সন্তানদের স্মৃতির উদ্দেশ্যে সম্মান জানাচ্ছি।  বাংলা সাহিত্যকে আর্ন্তজাতিক পরিমন্ডলে যেই মহান সাধক সম্মানের সর্বোচ্চ আসনে অধিষ্ঠিত করেছেন, তিনি কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। আজ
আর্ন্তজাতিক মাতৃভাষার দিনে তার জন্য অন্তরের অন্তস্থল থেকে শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা। বিশ্ব পরিমন্ডলে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যকে বিশ্ব সভায় মর্যাদায় একজন নির্ভত সাধকের অবদান আজোও অজানা, তিনি বিশ্ব সৎসঙ্গের প্রতিষ্ঠাতা বাংলাদেশের পাবনার সন্তান শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূল চন্দ্র। তার রচিত শতাধিক বাংলা সাহিত্যে উঠে এসেছে সনাতন ধর্মের শাশ্বত রূপ। সংস্কৃত ও হিন্দী ভাষার অর্গল ভেঙ্গে সনাতনী ধর্মতত্ত ও মানবিক সাহিত্য স্থান করে নিয়েছে বাংলার সাধারণ মানুষের পল্লীগৃহে। বেদ, উপনিষদ ও পুরানের কঠিনতম সংস্কৃতকে তিনি সরল ভাষায় মানুষের নিত্য নৈমত্তিক জীবনের অপরিহার্য কার্যে পরিণত করেছেন। যার উল্লেখযোগ্য দিক ছড়া সাহিত্যে। মানবিক জীবনের কঠিনতম সত্যগুলোকে তিনি বাংলা সহজ ছড়াতে অবমুক্ত করেছেন আর বাড়িয়েছেন বাংলা ছড়া সাহিত্যের মর্যাদা। ভুমিকা না বাড়িয়ে শ্রীশ্রীঠাকুরের বাংলা ছড়া সাহিত্যে গিয়ে দেখি আমি যা বললাম, তার কতটুকু সত্য।

প্রথমেই উল্লেখ করছি একটি ছড়া,
‘মানুষ আপন টাকা পর / যত পারিস মানুষ ধর। ’

যখন বিশ্বে সবাই অর্থের পিছনে ছুটতে প্রাণান্ত । তিনি তার গতির সামনে দাড়িয়ে খুব সহজ ভাষায় প্রকাশ করলেন প্রকৃত সত্য। কি অবাক বিষয় তাই না! কিন্তু কেন? পৃথিবীতে ক’জনই বা এরকম ভাবে বলতে পারে?

প্রকৃতপক্ষে, মানুষের প্রতি যদি অকৃত্রিম ভালবাসা অনুপস্থিত হয়, তাহলে কখনই বলা সম্ভব হবে না, কিছুটা অবিশ্বাসই হবে। কখনই মন খুলে বলা যাবে না,

‘ভালবাসার টান / কর্মে আনে সফলতা  / জীবনে উত্থান । ’

কিন্তু এ মানব প্রেমিক এভাবে তার শিক্ষা সহজ ছড়ায় ছড়িয়েছেন সাধারণের কাছে। এ বাংলা মায়েরই সন্তান তিনি। যার কথা জানার জন্য আজ বাংলা-ভারত তথা সারা বিশ্বে অনেকেই বাংলা ভাষার চর্চা করছেন।

এ বাংলা ভুমির প্রতি তার যে অকৃত্রিম ভালবাসা তা প্রকাশেও কোন কার্পণ্য নেই তাঁর।
‘ ,,,কত ভাগ্যে সোনার বাংলায় জন্মলাভ করেছি, ইচ্ছা করে এর ফল-জল, আলো-হাওয়া, খাদ্য-খাওয়া, øেহ-প্রীতি, প্রাকৃতিক মাধুর্য প্রাণ ভরে উপভোগ করি।  বাঙালির মহৎ কিছু দেবার আছে জগতকে। বাংলা জাগলে … জগৎ জাগবে। ’

এভাবেই অসংখ্য অতি সহজ-সরল ছড়াতেই তিনি দিয়েছেন মানুষের ব্যক্তিগত জীবনের অনেক বড়ো জটিল সমস্যার সমাধান। তাঁর নিজের জীবনের শুরুতেও আছে একটি ছড়া, যা রচনা করেছিলেন ঠাকুর জননী মনোমোহনী দেবী।
‘অকূলে পড়িলে দীনহীন জনে, / নুয়াইও শির কহিও কথা  । / কূল দিতে তাওে সেধো প্রাণপণে / লক্ষ্য করি তার নাশিও ব্যথা।’
প্রত্যেক চরণের প্রথম অক্ষর দিয়ে রাখা হয়েছিল তাঁর নাম। জননীর সে আশা বিফলে যায়নি। বাস্তব কর্মে তিনি সারাটি জীবন তুলে ধরেছেন এ ছড়ার সার্থকতা।

শিশু শিক্ষায় তিনি খুবই গুরুত্ব দিয়েছিলেন। যা উঠে এসছে তার ছড়া সাহিত্যে। শিশু মনের অপরিসীম কৌতুহলকে গুরুত্ব দেয়ার আর্জি তিনি রেখেছেন বার বার। সন্তানের ঝোঁক বা আগ্রহ  না বুঝে শিক্ষা দিলে তার ফল কি হতে পারে তা নির্দেশ করে তিনি বলেছেন,
‘ঝোঁক না বুঝে শিক্ষা দিলে / পদে পদে কুফল মিলে । ’

ভাবতেই অবাক লাগে, আধুনিক যুগের মনোবিজ্ঞানীরা শিশুমনের খুটিনাটি নিয়ে গবেষণা করে যে পরামর্শ আজকাল দিচ্ছেন, তা কত আগে দিয়ে রেখেছেন বাংলার অজ পাড়াগাঁয়ের সন্তান শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র। যার আসল নাম অনুকূল চন্দ্র চক্রবর্তী।

শিশুমনের খেয়াল-খুশির অলি-গলি ঘুরে তিনি বলেছেন,
‘শিশু যখন আধবুলিতে / যে  লক্ষ্যেতে যা যা কয়- / তা না বুঝে চাপান কথায় / আনেই বোধের বিপর্যয় । ’

আধুনিক যুগের কোন মনোবিজ্ঞানী কি এ যুক্তি উপেক্ষা করার সামর্থ্য রাখেন? বরংচ এ থেকে আমাদের অনেক কিছুই শিখার আছে এবং সন্তানকে যোগ্যতর করে গড়ে তুলতে এ শিক্ষা খুবই প্রয়োজন।

শিশুকে শাসনের নামে যে নির্যাতন অভিভাবকেরা সন্তানের ভবিষ্যত জীবনের ভালর জন্য করেন (মনে করেন), তার বিষয়ে শ্রীশ্রীঠাকুর কঠোর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছেন। তিনি তাঁর সহজ-সরল ছড়ায় বলেছেন,
‘ভাল কিছু করতে গিয়ে / আসে যদি হটেই ছেলে / এমনি করেই উস্কে দিবি / বাহবা নিতে করেই ফেলে।’

ঠাকুর সন্তান পালনে বাবা-মা’কে আরো অনেক বেশী দায়িত্বশীল হওয়ার আহবান জানিয়েছেন। কেবল শিশুকে উপদেশ দিলেই তারা ভাল হবে না, ভালো হবার সকল গুণাবলী পরিবারের বড়োদেরই আগে আচরণ করে দেখাতে হবে এবং ঘরের ছোটদের সামনে উদাহরণ সৃষ্টি করতে হবে। আবারও ছড়ার ভাষায় বলেছেন,
‘নিজ অভ্যাস ব্যবহার / ঘৃণ্য রেখে যদি / সন্তানের হতে ভাল বলিস নিরবধি / উল্টো হবে পারবি না তা / ক্ষোভে ভরবে মন / অভ্যাস আর ব্যবহারে / থাকিস সচেতন। ’

বর্তমানে পারষ্পিরিক শ্রদ্ধাবিহীন পারিবারিক জীবনে স্বামী-স্ত্রীর অনিয়ন্ত্রিত আচরণের দিকে নজর দিয়ে তিনি বলেছেন,
‘স্বামী-স্ত্রীতে ঝগড়া করে / ছেলে-পুলেয় দেখে / গোল্লায়েরই সদর দ্বারে / বাছাগুলোয় রাখে ।’

অনেকেই হয়ত ভাবছেন তিনি শুধু অন্যের জন্যই উপদেশ দিয়েছেন। উপদেশ দেওয়া সহজ কিন্তু পালনেই তার সার্থকতা।
এ চরম সত্যটিও বলতে ভূলে জাননি বাস্তব জীবনে একাগ্র ও কর্তব্যনিষ্ঠ শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র। তাই অন্যকে উপদেশ প্রদানের আগে নিজের জীবনে তা প্রতিফলনের পরামর্শ দিয়েছেন,
‘উপদেশ তুই দিস্ না যতই / উদাহরণ হ’ আগে, সঞ্চারণায় দীপ্ত করিস্ / তৃপ্ত দীপন রাগে। ’

বাংলার মাটি ও মানুষের খুবই কাছের এ মহান সাহিত্যিক, সাহিত্যের দৃষ্টিকে নামিয়ে এনেছেন সমাজের প্রান্তিক পর্যায়ে। এটাই তাঁর ছড়া সাহিত্যের অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত। বাংলার সাহিত্য যাদের ছাড়া অর্থহীন সেই কৃষকদের নিয়েও তিনি দিয়েছেন অনেক ছড়া। তাঁর কথায় তিনি বলেছেন, ‘ছোট থেকেই মানুষকে ভালবাসতাম-কারও দুঃখ দেখতে পারতাম না। কাউকে দুর্দশাগ্রস্থ  দেখলে মনে হতো আমি নিজেই ঐ অবস্থায় পড়ে গেছি। …বিদ্যেবুদ্ধি, টাকা-পয়সা, লোকবল কোন সম্বলই আমার ছিল না। কিন্তু একমাত্র ভালবাসার সম্বল বুকে করে দুঃসাহসিকের মতো চলেছি- কোন কাজকে অসম্ভব বলে মনে করিনি। মানুষের যাতে ভাল হয়- তা না করে আমার উপায় ছিল না।  ’

সাধারণের সাথে মিশে যাওয়া এ সাহিত্যিকের ছড়ায় চলে এসেছে,
‘চোত-বোশেখের মাঝখানে র্ক / আশুব্রীহির বপন শেষ / খরা ঝরা হোক না যেমন / প্রায়ই ফসল পাবি বিশেষ। ’
যারা তাদের মাথার ঘাম ঝরিয়েও প্রাপ্য ফসল ফলাতে ব্যর্থ হয় তাদের উদ্দেশ্যে বলেছেন,
‘ক্ষেতের গুণে বীজের বাড় / যেমনি বীজ তেমনি ঝাড়। ’
আরো বলেছেন,
‘উর্বরা নয় ক্ষেতটি যেথায় / সুবীজও কি ফলবে সেথায়?’

মানুষের আত্মকর্মসংস্থানকেই তিনি বেশী গুরুত্ব দিতেন। বর্তমানে আমরা দেখছি চাকরি প্রত্যাশী দাসত্বপ্রিয় এক তরুন সমাজ। আর এ আত্মনির্ভশীলতায় কৃষিকে তিনি গুরুত্ব দিয়েছেন সর্বাপেক্ষা বেশী।
‘জমিজমা কৃষিভরা / ধান্য-গোধুম-শালী / প্রলয়েও সে নষ্ট না পায় / যাপে স্বজন পালি।’

এবার আসি মানব জীবনে অতি গুরুত্পূর্ণ অংশ শিক্ষায়। তার আগে বলে রাখা ভাল, মানব জীবনের প্রতিটি অধ্যায় সম্পর্কে খুবই সহজ-সরল ভাষায় ছড়া দিয়েছেন ঠাকুর অনুকূলচন্দ্র। একজন মানুষের জীবনে চলতে গিয়ে যা যা প্রয়োজন তার সবটাই কোন না কোনভাবে উঠে এসেছে তাঁর ছড়াসাহিত্যে। শিক্ষার কথা বলতে গিয়ে তিনি প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি বাস্তবজীবনে ব্যবহারিক শিক্ষাকেও সমান কাতারে দাড় করিছেন,
‘অভ্যাস, ব্যবহার ভাল যত / শিক্ষাও তার জানিস্ তত। ’

আমাদের প্রচলিত ধারার শিক্ষাকে যেভাবে আমরা পুঁথিগত বিদ্যায় আটকে রেখেছি তার ঘোর বিরোধী ছিলেন। বই পড়ে জানলাম অথচ বইয়ের জ্ঞানকে কোথাও কাজে লাগালাম না, তবে সেই বই পড়ার সার্থকতা কোথায়? এই বিষয়টি তিনি ছড়াকারে বলেছেন,
‘বই পড়ে তুই হলি যে বই / বইয়ের নিদান ধরলি না, / ধরে ধরে না চললে কি / জাগবে বোধের নিশানা? ’

সবসময়ই প্রায়োগিক শিক্ষাকে তিনি ঊর্দ্ধে স্থান দিয়েছেল। বর্তমানে ছন্দহারা তরুনদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেছেন,
‘শিখলি যে তুই কত শত / বোধ তো কিছুই ফুটলো না, / স্মৃতির বলদ হলি শুধু / এক মুঠো ভাত জুটলো না !’

আমরা সমাজে এমন সব লোকই বেশী দেখতে পায় যারা মুখে মস্ত বড় বিদ্ধান, কিন্তু বাস্তবে তার ধারে কাছেও  থাকেন না। এ ধরণের মৌখিক সর্বস্ব জ্ঞানকে এবং জ্ঞাণীকে ঠাকুর অপ্রয়োজনীয় বলে বাতিলের খাতায় স্থান দিয়েছেন। তিনি ছড়ার ছন্দে অতি সহজে এসব জ্ঞান পাপীদের ব্যঙ্গ করে বলেছেন,
‘মুখে জানে ব্যবহারে নাই /  সেই শিক্ষার মুখে ছাই। ’
আজ একবিংশ শতাব্দিতে আমরা শিক্ষায় যে নৈরাজ্য ও নীতিহীনতা লক্ষ্য করছি তার জন্য অধিকাংশ ক্ষেত্রেই শিক্ষক। তাই তিনি বলেছেন,
‘ চরিত্রহীন শিক্ষক / ছাত্রের জীবন ভক্ষক।’

কিন্তু আমরা যদি শিক্ষকদের এ চারিত্রিক স্খলনের কারণ খুজতে যাই, তাহলে আমরা শিক্ষকদের সামাজিক জীবনের চরম নিরাপত্তাহীনতায় লক্ষ্য করি। তাই তিনি শিক্ষকদের দায়িত্ব সমাজকে গ্রহন করতে বলেছেন। এর কারণ, শিক্ষক শিক্ষাদান করা ছাড়া যেন আর কিছু নিয়ে শিক্ষককে ভাবতে না হয়। এমনকি তিনি তার পরিবারের ভরণ-পোষণের বিষয়ে ভাববেন না। এ দায়িত্ব সমাজ তথা রাষ্ট্রের। বৈষয়িক বা পার্থিব চিন্তা মাথায় না রেখে শিক্ষাদানে একনিষ্ঠ একজন শিক্ষকের পক্ষেই আদর্শ ছাত্র গড়ে তোলা সম্ভব।
তাই শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র বলেছেন,
‘শিক্ষকদের প্রতিপালন ভার / গ্রামের কিন্তু নেওয়া ভাল, / নইলে শিক্ষক চাকুরি বশে / হয়ে উঠে ক্রমেই কালো।’

আমাদের জীবনে যাদের একান্ত অনুপ্রেরণা আমাদের জীবন যুদ্ধে মনোবল অটুঁট রাখে, তার অগ্রভাগেই থাকেন, বাবা-মা। আপন জননীকে ঠাকুর প্রাণের উৎস জ্ঞাণে ভালবাসতেন। মা’কে খুশি করতে তিনি সবকিছু করতে প্রস্তুত ছিলেন।
ছড়ার ছন্দে প্রায়ই বলতেন,
‘ বিদ্যাসাগর, স্যার আশুতোষ / কোথায় পেলেন শক্তি? / দেখ্ না চেয়ে তার পিছনে / আছেই মাতৃভক্তি।’
আরো বলেছেন,
‘মাতৃভক্তি অটুঁট যত / সেই ছেলে হয় কৃতি তত।’
‘পিতায় শ্রদ্ধা মায়ে টান / সেই ছেলে হয় সাম্যপ্রাণ।’

শুধুমাত্র মায়ের ইচ্ছা পূরণে তিনি ডাক্তারি পড়তে যান কলকাতায়। শিক্ষা শেয়ে তিনি মানুষের শারিরীক যন্ত্রনা লাঘবে ঝাপিয়ে পড়েন। অতি অল্প সময়েই তিনি বিচিত্র মানুষ ও সমস্যার মুখোমুখি হন। চিকিৎসকসমাজের চারিত্রিক করুন দশা অবলোকন করে তিনি ছড়া লিখলেন,
‘চিকিৎসাতে চাস্ যদি তুই / আত্মপ্রসাদ টাকা, / টাকার পানে না তাকিয়ে তুই / রোগীর পানে তাকা।’

এবার আসি বিজ্ঞান জগতে। এ যুগ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির যুগ। শ্রীশ্রীঠাকুর বলেছেন, ‘আমি সাহিত্য, বিজ্ঞান, শাস্ত্রতত্ত্ব, ইতিহাস কিছুই জানি না। কিন্তু যা আমি নিজে দেখেছি সেই দর্শনে আমার বোধ যতটুকু ধরতে পারে তাতে কিছুই বাদ পড়েছে বলে মনে হয় না। আমি যা কিছু বলি, ওর ভিত্তির উপর দাঁড়িয়েই বলি। তাই আমার বলা সম্বন্ধে, আমার কোন সংশয় নেই।  ’

সাহিত্যের অনেক প্রাজ্ঞজনরা যখন সাহিত্যের সংজ্ঞা খুজতে নিজের মাথার চুল টেনে ছিঁড়ছেন, তখন ঠাকুর অতি সহজ ছড়ায় বললেন,
‘যা ধরে যার চর্চা করে /  সঙ্গ করে যার, / হিত প্রেরণায় উন্নীত হয় / সাহিত্য সেই সার।’

বিজ্ঞান প্রসঙ্গে সংজ্ঞায় তিনি বললেন,
‘বস্তুর বিশেষ রূপায়িত তাৎপর্য্যে / তার বৈশিষ্ট্য আছে, / কিন্তু ঐ বৈশিষ্ট্যেও দ্বিত সম্ভব হয় না, / বৈশিষ্ট্য সদৃশ হতে পাওে, / কিন্তু সমান না।’

ব্যবসার নীতি সম্পর্কে খুব কম কথায় বললেন,
‘মূলধনে দিলে হাত / ব্যবসা হবে চিৎপাত।’

যারা ক্ষুদ্র শিল্পোদ্যক্তা ও ব্যবসাযী তাদের দিক-নিদের্শনা দিয়েছেন। একেবারে প্রান্তিক পর্যায়ের দোকানদারদের উদ্দেশ্যে বলেছেন,
‘দোকান করিস্ দোকানদার! / রাখিস্ নিপুন সদ্-ব্যবহার, / লাভের অর্ধেক পেটে খাবি – / এই নিয়মে চলতে থাকবি, / মনে রাখিস্ – রাখিস্ নে দেনা- / বাঁচার পথে বিষম কাঁটা / বিশেষ করে জানিস সেটা।’

ধর্ম  মানুষকে সহিঞ্চুতার শিক্ষা দেয়। আজ ধর্ম নিয়ে সমাজে-সমাজে, দেশে-দেশে যে হানাহানি সে বিষয়ে শ্রীশ্রীঠাকুরের অভিমত খুবই স্পষ্ট। তিনি দ্ব্যর্থহীন কন্ঠে বলেছেন,
‘ধর্মে সবাই বাঁচে-বাড়ে / স¤প্রদায়টা ধর্ম নারে ।  ’
‘ধর্মে জীবন দীপ্ত রয় / ধর্ম জানিস্ একই হয়।’

সমাজের সুবিধাবাদী ও ভ্রষ্ট নেতা, যাদের উপস্থিতিতে আজ সাধারণ জনগন দিশেহারা, তাদের দিকে আঙুল উচু করে তিনি বলেছেন,
‘ইষ্ট নাই নেতা যেই / যমের দালার কিন্তু সেই । / গন্ডীস্বার্থী হবে যে / নকল নেতা জানিস্ সে।’

জীবন চলনায় দারিদ্রতার কারণ সম্পর্কে বলেছেন,
‘দরিদ্রতার শ্রেষ্ঠ বর / নেওয়ায় গরজ দেওয়ায় ডর।’

ভালোমন্দ মানুষের বিষয়ে বলেছেন,
‘ টাকা রেখো গুণে গুণে / মানুষ নিও চিনে-শুনে। ’

কিছু দৈনন্দিন বিষয়, যা আমরা তেমন গুরুত্ব দিতে চাই না, কিন্তু আমাদের জীবনে প্রভাব বিস্তার করে এমন ছড়া।

‘খাবার পাতে শেষ কালেতে / খাস্ যদি তুই নুনে-টকে, / অনেক আপদ কাটবে তাতে / জানে অনেকে ঠকে-ঠকে।’

আমাদের অতি পরিচিত ছড়াকার সুকুমার রায়। তিনি ‘কিন্তু সবার চাইতে ভালো পাউরুটি আর ঝোলাগুড়’ বলে থেমে গেছেন। শ্রীশ্রীঠাকুর তারপরে আরো যোগ করেছেন,
‘টক দই কিন্তু নেহাৎ ভাল / ঝোলাগুড়ে খাস্ যদি, / অনেক বালাই দূও কওে এই / প্রাচীন নীতি টক দধি। ’

জীবনের শেষের দিকের জীবন তিনি কাটিয়েছেন ভারতের বর্তমান ঝাড়খন্ডের দেওঘরে। শারিরীক অসুস্থতার জন্য ১৯৪৬ সালে ডাক্তারের পরামর্শে হাওয়া পরিবর্তনের নিমিত্তে সেখানে যান । কিন্তু সেই যাওয়া, আর ফেরা হয়নি জননীসদৃশ এ বাংলার মাটিতে। বার বার তিনি এ বাংলার কথা বলেছেন দেশ-বিদেশের অনেক বিশিষ্ট জনকে। আপন ভিটে-মাটিকে জীবনের শেষদিন পর্যন্ত আকঁড়ে থাকার পরামর্শ দিয়েছেন। তাও ছড়াতে,
‘ভিটে-মাটি বাড়ির যেটা-/ পূর্বপুরুষ করেছে বাস, / শ্রদ্ধাভরে রাখিস্ সেটা / ছাড়বি না তা গেলেও শ্বাস।’

এ বাংলা, বাংলার মাটি, বাংলা ভাষা বিশেষভাবে পাবনার ভাষার কথা প্রায়ই তিনি বলতেন। তার নিজ বিবৃতিতে পায়,
‘পূর্ব বাংলা আমার কাছে পূর্ণ্যতীর্থ। … সে দেশের মানুষকে আমি ভুলতে পারিনে। ..তারাও আমাকে ভুলতে পারে না। রাত্রে ঘুম ভেঙ্গে গেলেই পাবনার কথা মনে পড়ে। ’

জীবনের শেষদিন পর্যন্ত নিজের দেশ ও দেশের মানুষের প্রতি তার মনে ছিল অপরিসীম ভালবাসা। কিন্তু এরকম মানুষের বাংলা ছড়াসাহিত্যে যে অবদান তা আজ কেউ আলোচনাও করে না, তার যথাযোগ্য সম্মাননাও তিনি আজো রাষ্ট্রের কাছ থেকে পাননি। তিনি বাংলা ছড়া সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছেন প্রায় ৮,৮২৯ টি ছড়া দিয়ে। এ পরিমাণ ছড়া বাংলা সাহিত্যে আর কেউ লিখেছেন কিনা জানি না। সাহিত্যের অন্যান্য শাখায় তাঁর অবদান অন্যকোন প্রবন্ধে লেখার চেষ্টা করব। আমার ক্ষুদ্র জ্ঞানে এটুকু বলতে পারি বাংলাসাহিত্যের ইতিহাস শ্রীশ্রীঠাকুরকে ছাড়া লেখা সম্ভব নই। আজ ভারতে ও বিশ্বে বিভিন্ন জায়গায় ভিন্ন ভাষাভাষীরা শুধুমাত্র বাংলাকে ভালবাসে এবং চর্চা করে তাদের পরমারাধ্য প্রাণের মানুষ শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের কারণে। সমগ্র সনাতনী দর্শনকে তিনি বাংলা ভাষায় নিয়ে এসেছেন, কিন্তু এ স্বীকৃতি তিনি পাননি।

তার ভাষায়, ‘ইচ্ছা করে স্পেশাল ট্রেনে করে মানুষ, গরু, চৌকি নিয়ে আনন্দ করতে করতে দেশে ফিরে যাই। পরম পিতার দয়ায় সে সুযোগ যদি জোটে, যাবার সময় গাড়ির মধ্যে গান লাগায়ে দেব, গাইতে গাইতে যাব।’

আজ সময় এসেছে এ বাংলার মাটি ও ভাষা প্রেমিককে প্রকৃত রাষ্ট্রীয় সম্মান দানের। আর সাধারণের উচিত তার বাংলা ছড়া পাঠ অতি সহজেই দৈনন্দিন জীবনের কার্যাবলীকে আরো পরিশীলিত করে নেওয়া। বাস্তবে পালন করে আমরাই গড়ে তুলতে পারি সুখী সমৃদ্ধ একটি পৃথিবী। জয়গুরু, বন্দে পুরুষোত্তমম্ ।

লেখক: কম্পিউটার প্রকৌশলী