December 4, 2022

দৈনিক প্রথম কথা

বাংলাদেশের জাতীয় দৈনিক

কিশোর কিশোরীদের স্বাস্থ্য ও পুষ্টি

ডেস্ক: কিশোর বয়স এমন একটি বয়স যা ছেলে বা মেয়ে উভয় সন্তানের জন্যই খুবই গুরুত্বপুর্ন । এ বয়সে তাদের শরীরে বিভিন্ন ধরনের আমূল পরিবর্তন ঘটে যার কারণে এ পরিবর্তন যাতে ব্যাহত না হয় এবং সুস্থ্য সুন্দরভাবে বেড়ে উঠে তার জন্য কিশোর কিশোরীদের দৈনন্দিন খাবার তালিকা পুষ্টিসমৃদ্ধ হওয়া আবশ্যক । প্রতিদিনের খাবার তালিকাতে পুষ্টিসমৃদ্ধ খাবার রাখার জন্য পুষ্টি ও খাদ্য সংক্রান্ত সাধারন ধারনা থাকা আবশ্যক । মা বাবা সন্তান সবার জানা থাকলে সচেতনভাবে প্রতিদিনের খাদ্য তালিকাতে পুষ্টিযুক্ত খাবার যাকে সুষম খাবার বলা হয় তা রাখা সম্ভব হবে এবং কিশোর কিশোরীরা সুন্দর ও সুস্বাস্থ্য ‍নিয়ে বেড়ে উঠবে ।

তাহলে আমাদের সবার সুষম খাবার, খাদ্য ও পুষ্টি কি এবিষয়গুলো নিয়ে আলোকপাত করার প্রয়োজন আছে যা এখানে আমি খুব সংক্ষিপ্তভাবে তুলে ধরছি।

সুষম খাদ্যঃ সুষম খাদ্য হচ্ছে সেই খাদ্য যে খাদ্যের মধ্যে সব পুষ্টি উপাদান রয়েছে, যা দেহের প্রয়োজন মত, বয়স ও লিঙ্গ ভেদে সঠিক মাত্রায় থাকে। অর্থাৎ সুষম খাবার হলো এমন একটি খাদ্য যা শরীরে শক্তি উৎপাদন করে, শরীর বৃদ্ধি করে ও রোগ প্রতিরোধে সহায়তা করে। প্রত্যেকের সামর্থ্য ও অবস্থা এর উপর নির্ভর করে সে এই তিন ধরনের সুষম খাবার খেতে পারে । বেশী খরচ করে যেমন সুষম খাবার খাওয়া যায় তেমনি অল্প খরচের মধ্যেও সুষম খাবার খাওয়া সম্ভব তবে সুষম খাবার কাকে বলে সেটা জানতে হবে ।

মনে রাখতে হবে সুষম খাবার মানেই তিন ধরনের কাজ থাকে ১) শক্তি উৎপাদন করে ২) শরীর ক্ষয়পূরণ ও বৃদ্ধি সাধন করে ও ৩) রোগ প্রতিরোধ করে।

খাদ্য ও পুষ্টি বলতে কি বুঝায় সেটাও আমরা জেনে নিতে পারিঃ

খাদ্যঃ খাদ্য হচ্ছে এমন কতগুলো প্রয়োজনীয় উপাদানের সমষ্টি যা গ্রহণের মাধ্যমে শরীরের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ও কর্মক্ষমতা বজায় থাকে, ক্ষয়পূরণ ও বিভিন্ন কাজের জন্য প্রয়োজনীয় শক্তি যোগান দেয় এবং সর্বোপরি রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরী করে।

পুষ্টিঃ পুষ্টি হচ্ছে এমন একটি প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে গ্রহণ করা খাদ্য শোষিত হয়ে শরীরে তাপ ও শক্তি উৎপাদন করে, শরীরের বৃদ্ধি সাধন করে, শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা সৃষ্টি করে।

কৈশরকালীন বৈচিত্রময় খাবারের গুরুত্বঃ

কৈশরকালীন পুষ্টি সমস্যার সাথে শারিরীক, মানসিক ও আর্থ-সামাজিক কারণ জরিত থাকে । কৈশর কালে খাবার এমন হতে হবে, যেন সেই খাবার পরিমাণে সঠিক হয় এবং এতে খাদ্যের যে ছয়টি উপাদান রয়েছে তা বিদ্যমান থাকে । একই রকম খাবার সবসময় ভাল লাগবেনা, তাই মাঝে মাঝে ভিন্ন ভিন্ন ধরনের খাবার খেতে পারলে ভাল হয় । এতে খাবারের রুচি বাড়ে । কৈশরে ছেলেমেয়েরা লেখাপড়া ও খেলাধূলা নিয়ে ব্যস্ত থাকে, তাই তাদের ঘরে তেরী খাবার ও পুষ্টি সমৃদ্ধ খাবার দিতে হবে । তবে কৈশরে ছেলে মেয়েদের মনে হবে যে, রাস্তার খোলা খাবার, চানাচুর, আচার, চটপটি, চিপস, আইসক্রিম, কোমল পানীয়, জুস ইত্যাদি মূখরোচক খাবার খুব মজার এবং এগুলোই খেতে পছন্দ করে । এসব খাবারগুলোতে চর্বি ও শর্করার মাত্রা বেশী থাকে যা পরবর্তী জীবনে স্থুলতা, হৃদরোগ এবং ডায়াবেটিসের মতো রোগ হওয়ার ঝুকি থাকে ।

খাদ্যের উপাদানঃ খাবারকে মোট ছয়টি উপাদানে ভাগ করা যায় । একই খাবারে আবার খাদ্যের বিভিন্ন বা একাধিক উপাদান থাকতে পারে। যথাঃ

১. শ্বেতসার বা শর্করা (কার্বোহাইড্রেট) উৎস: ভাত, রুটি, আলু, মুড়ি, চিড়া, খৈ, চিনি, মধু ইত্যাদি
২. তেল ও চর্বি,উৎস: তেল, মাছ – মাংসের চর্বি, মাখন, ঘি ইত্যাদি
৩. আমিষ (প্রোটিন), উৎস: মাছ, মাংস, ডিম, দুধ, ডাল, বাদাম, বীচি ইত্যাদি
৪. ভিটামিন, উৎস: দুধ, ডিম, কলিজা, সব ধরনের শাক-সব্জি, ফল ইত্যাদি
৫. খনিজ উপাদান, উৎস: মাছ, মাংস, কলিজা, দুধ, ডিম, গাঢ় সবুজ শাক- সব্জি, লবণ ইত্যাদি
৬.পানি

আমি আগেই বলেছি যে, আমরা প্রতিদিন যে খাদ্য গ্রহণ করি তা পুষ্টিগুণ অনুযায়ী সাধারণত তিন ভাগে ভাগ করা যেতে পারে। কোন কাজের কি ধরনের খাদ্য তালিকাতে রয়েছে তা আমরা জেনে নিতে পারি । যেমন-
১. তাপ ও শক্তি উৎপাদনকারী খাদ্য: (শর্করা ও চর্বি জাতীয় খাবার যেমনঃ ভাত, রুটি, আলু, গুড়, চিনি, মিষ্টিআলু, পাউ রুটি, তেল, মাখন, ঘি,চর্বি, মধু, গুড়, বিস্কুট, বাদাম, নারকেল ইত্যাদি)
২. শরীরের ক্ষয় পূরণ ও বৃদ্ধিকারক খাদ্য: (আমিষ জাতীয় খাবার যেমনঃ মাছ, মাংস, সয়াবিন ও অন্যান্য ডাল, দুধ, ডিম, সিমের বীচি, ছোটমাছ, বড়মাছ, কলিজা ইত্যাদি)
৩. রোগ প্রতিরোধকারী খাদ্য: (ভিটামিন ও খনিজ সম্মৃদ্ধ খাবার যেমনঃ গাঢ় হলুদ ও সবুজ রঙের সব ধরনের শাক ও ফলমূল, পাকা আম, পাকা তাল, পাকা পেঁপেঁ, পাকা কাঁঠাল, আনারস, পেয়ারা, আমলকি, আমড়া, কলা, লেবু, গাজর, মিষ্টিকুমড়া, শিম, ছোটমাছ, দুধ, ডিম, কলিজা ইত্যাদি)
যাতে খাবারে অরুচি কমানোর জন্য ও কিভাবে খাবারে বৈচিত্রতা আনা যায় তার কিছু উপায় বলছি ।
১) খাবার এমন হতে হবে যেন সেই খাবার পরিমাণে সঠিক হয় এবং সবরকম পুষ্টি থাকে ।
২) পরিমাণমত ও উপযুক্ত অর্থাৎ যে খাবারের মধ্যে যথেষ্ট পরিমান শক্তি, আমিষ এবং অনুপুষ্টির চাহিদা পূরন করেবে ।
৩) একই খাবার খেতে ভাল লাগেনা তাই মাঝে মাঝে খাবারের ম্যানু পরিবর্তন করতে হবে ।

মাঝে মাঝে খাবারের ম্যানু পরিবর্তন করতে হবে ।

কিশোর কিশোরীদের প্রতিদিনের খাদ্য তালিকার একটি নমুনাঃ

প্রতিদিন কিশোর কিশোরীদের নানা জাতীয় পুষ্টি উপাদান সমৃদ্ধ খাবার খেতে হয় । একজন কিশোর বা কিশোরী কি কি খাবার খেলে তার দৈহিক পুষ্টি চাহিদা পূরন হবে তার একটি নমুনা দেয়া হলো ।

সকালের খাবার (৮টার মধ্যেই) ঃ – মাঝারি সাইজের রুটি বা বাটি ভাত, একবাটি সবজি, একটি ডিম
সকালের নাস্তা (১১টার দিকে) ঃ যে কোন দেশী মৌসুমী ফল, বাড়ীতে তৈরী কিছু নাস্তা জাতীয় খাবার
দুপুরের খাবারঃ ২/৩ বাটি ভাত, ১ বাটি শাক ও সবজি, ১ বাটি ঘন ঢাল,১ টুকরা মাছ/মাংস বা কলিজা
বিকালের নাস্তা ঃ দুধ দিয়ে তৈরী ঘন যে কোন খাবার(পায়েস, দই হতে পারে),যে কোন দেশী মৌসুমী ফল, বাড়ীতে তৈরী হাল্কা যে কোন খাবার
রাতের খাবারঃ ২.৩ বাটি ভাত, ১ বাটি শাক সবজি, ১ বাটি ঘন ডাল, ১ টুকরা মাছ বা মাংস।

খাবার গ্রহনের সাথে সাথে পর্যাপ্ত ঘুম নিশ্চিত করতে হবে। প্রতিদিন ৮-১০ ঘণ্টা ঘুমাতে হবে। ঘুম শরীর ও মনকে শিথিল করে, দুশ্চিন্তা ফ্রি করে, যা কিশোর-কিশোরীদের শারীরিক বৃদ্ধি ও সুস্বাস্থ্য গঠনে সহায়তা করে।

সূত্র: বিডিটাইপ